এখন দেশীয়দের আধিপত্য চায়ের সাম্রাজ্যে

অর্থনীতি

অনলাইন ডেস্কঃ উপমহাদেশে চা চাষের শুরু ব্রিটিশদের হাতে। বাজার তৈরিতে তারা শুরুতে বিনা পয়সায় চা তুলে দিয়েছিল মানুষের মুখে। চাষ, বিপণন, রপ্তানি ও বাগানের মালিকানা—সবকিছুতেই ছিল তারা। একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতন হলেও চায়ের বাজারে আধিপত্য ঠিকই ধরে রেখেছিল। সেই আধিপত্যের গল্প এখন নতুন করে লেখা হচ্ছে দেশি শিল্প গ্রুপের হাত ধরে।

দুই দশকে ব্রিটিশ কোম্পানি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগান ইজারা নিয়ে বিনিয়োগ করেছে দেশীয় শিল্প গ্রুপগুলো। এই তালিকায় আছে ১৮টি শিল্প গ্রুপ। আভিজাত্য ও অবকাশযাপনের কেন্দ্র হিসেবে না দেখে তাদের সিংহভাগই বাগান সংস্কার ও যন্ত্রপাতি আধুনিকায়নে বিনিয়োগ করেছে। তাতে কয়েক বছরে চায়ের উৎপাদন প্রত্যাশা ছাড়িয়েছে।

চা বোর্ডও দুই দশকে নতুন নতুন প্রকল্প নিয়েছে। চা চাষের আওতা বাড়াতে তদারকি বাড়িয়েছে। ক্ষুদ্র চাষি ও নতুন উদ্যোক্তাদের চা চাষে উদ্বুদ্ধ করেছে। তাতে দেড় শ বছরের বেশি সময় ধরে চা উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু সিলেট–চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে চা চাষের বিস্তার ঘটেছে উত্তরাঞ্চল ও পার্বত্য জেলায়।

চা উৎপাদনের এই সাফল্য জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার কয়েক বছর আগের অনুমানও ভেঙে দিয়েছে। সংস্থার একটি কমিটির আভাস ছিল, ২০২৭ সালে বাংলাদেশে চায়ের উৎপাদন দাঁড়াবে ৯ কোটি ৬৮ লাখ কেজিতে। গত বছরই দেশে চায়ের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ৬০ লাখ কেজিতে। এই সাফল্য এসেছে মূলত দেশীয় বড় গ্রুপের হাতে।

চা উৎপাদনের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দুই দশক আগে ২০০০ সালে স্টারলিং কোম্পানি হিসেবে পরিচিত ইউরোপিয়ান কোম্পানিগুলোর হাত ধরে উৎপাদিত হয় মোট উৎপাদনের ৪৮ শতাংশ চা। গত বছর তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ১৯ শতাংশ। আর ধারাবাহিকভাবে বেড়ে দেশীয় কোম্পানিগুলোর হাতে এখন উৎপাদিত হচ্ছে ৮১ শতাংশ চা।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির ইমেরিটাস অধ্যাপক ও সাবেক উপাচার্য এম এ চায়ে উৎপাদন ও উৎকর্ষ বাড়াতে বিদেশি উদ্যোক্তাদের যে বিনিয়োগ দরকার ছিল, শেষ দিকে সেটি তারা করেনি। দেশীয় শিল্প গ্রুপগুলো চা চাষকে অর্থকরী ব্যবসা হিসেবে নিয়ে বিনিয়োগ করেছে। সনাতন পণ্যের মধ্যে আটকে না থেকে চা খাতে বিনিয়োগ অবশ্যই ইতিবাচক দিক। এখন যেটি প্রয়োজন, তা হলো পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে চায়ের গুণগত মান বাড়াতে বিনিয়োগ করতে হবে। শুধু ব্ল্যাক টি উৎপাদনে আটকে না থেকে বৈচিত্র্যপূর্ণ চা উৎপাদনে নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে চা–শিল্পের শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ও দক্ষতা বাড়াতে হবে, যেটি চায়ের উৎপাদনের স্বার্থেই জরুরি।

পরিবর্তনের হাওয়া

দুই দশক আগে এই পরিবর্তন শুরু হলেও তাতে গতি পায় যুক্তরাজ্যের জেমস ফিনলে লিমিটেডের চা–বাগান হস্তান্তরের ঘটনার পর। যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত সোয়ার গ্রুপ ফিনলে লিমিটেডকে অধিগ্রহণ করে। তারা বাংলাদেশের ব্যবসায় মুনাফা না দেখে ২০০৫ সালে বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু করে। ২০০৬ সালের মার্চে ব্রিটিশ এই কোম্পানির হাতে থাকা ৩৯ হাজার ১১২ একর বাগানের সব শেয়ার আনুষ্ঠানিকভাবে কিনে নেয় ছয়টি গ্রুপ ও দুই ব্যক্তি। ছয়টি গ্রুপ হলো ইস্পাহানি, উত্তরা গ্রুপ (উত্তরা মোটরস), পেডরোলো, ইস্টকোস্ট, এবিসি গ্রুপ এবং এমজিএইচ গ্রুপ। এর মধ্যে শেষ তিনটি প্রথমবার এই খাতে বিনিয়োগ করেছে।

ফিনলে ছাড়াও গত দুই দশকে চা–বাগান ইজারা নিয়ে যুক্ত হয়েছে এ কে খান, আকিজ, স্কয়ার, সিটি, টিকে, ওরিয়ন, কাজী অ্যান্ড কাজী (জেমকন), ইউনাইটেড গ্রুপ, মোস্তফা গ্রুপ এবং প্যারাগন গ্রুপের মতো শিল্প গ্রুপ। এ ছাড়া বৈশ্বিক পারফিউম ব্র্যান্ড আল হারামাইন পারফিউমস গ্রুপ, পোশাক খাতের প্রতিষ্ঠান হা–মীম ও ভিয়েলাটেক্স গ্রুপও আছে এই তালিকায়। এ ছাড়া বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ব্র্যাক’ও বিনিয়োগ করেছে চা খাতে।

চা খাতে বিনিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফিনলে টি কোম্পানির চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, সে সময় চায়ের চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন সেভাবে বাড়ছিল না। তাতে চায়ের দামও নাগালের বাইরে যাওয়ার শঙ্কা ছিল। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তখন চা খাতে বিনিয়োগ করেছি। আগেকার দিনের মতো অবকাশযাপনের কেন্দ্র হিসেবে না রেখে শিল্প হিসেবে এই খাতে বিনিয়োগ হয়েছে। বাগান সংস্কার, যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন ও স্কুল, হাসপাতাল সংস্কারসহ শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নের জন্যও বিনিয়োগ শুরু হয়েছে। নতুন যেসব শিল্প গ্রুপ এসেছে, সবাই কমবেশি বিনিয়োগ করায় চা খাতে বাংলাদেশ সফলতা দেখিয়েছে।

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ইন্টরন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশনের এ বছর আয়ের দিক থেকে শীর্ষ ২৩ কোম্পানির তালিকা প্রকাশ করেছে। এই তালিকার শীর্ষ ১০টি গ্রুপের ৭টিরই ব্যবসা রয়েছে চা খাতে, যারা গত দুই দশকে যুক্ত হয়েছে।

চা–বাগান না থাকলেও লাইসেন্স নিয়ে চা বিপণনে যুক্ত হয়েছে আবুল খায়ের, মেঘনা, পারটেক্স স্টার ও এসিআই গ্রুপ। শুধু যুক্ত নয়, চা বিপণনে এখন আবুল খায়ের দ্বিতীয় এবং মেঘনা তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে।

দেশীয়দের হাতে সাফল্য

স্কটল্যান্ডে নিবন্ধিত কোম্পানি জেমস ফিনলে এ দেশ থেকে চা ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সময় তাদের সাতটি বড় বাগানে (কোম্পানির হিসেবে ১৬টি বাগান) চায়ের উৎপাদন ছিল ৯৪ লাখ কেজি। দেশীয় উদ্যোক্তাদের হাতে আসার পর বেড়ে গত বছর তা দাঁড়ায় ১ কোটি ৬৮ লাখ কেজিতে।

ফিনলের উদ্যোক্তারা জানান, চা–বাগানের মালিকানা তাঁদের হাতে আসার পর মুনাফার বড় অংশই বাগানে বিনিয়োগ করেছেন তাঁরা। তাতে উৎপাদনও বেড়েছে।

চা চাষে সাফল্যের কাহিনি আছে পানির পাম্প বাজারজাতকারী গ্রুপ পেডরোলোর হাতে। ২০০৩ সালে চট্টগ্রামের হালদা ভ্যালি বাগানটি ইজারা নেওয়ার সময় ছিল ঝোপঝাড়। উৎপাদন ছিল না এক কেজিও। পরিত্যক্ত বাগানটি ইজারা নেওয়াসহ এ পর্যন্ত ১২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে গ্রুপটি। এখন বাগানটিতে উৎপাদন হচ্ছে বছরে ১০ লাখ কেজি চা। ২০১৭ সালে হেক্টরপ্রতি উৎপাদনে শীর্ষস্থানও দখল করে বাগানটি। হালদাসহ গ্রুপটির হাতে দুটি বাগান আছে।

পেডরোলো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাদের খান বলেন, দেশে অনেক খাতে নীতি দ্রুত পরিবর্তন হয়। সে তুলনায় চা খাতে স্থিতিশীলতা আছে। এমনিতেই নতুন বিনিয়োগের খাতও সীমিত। মূলত বাজার বড় হতে থাকায় এই খাতে বিনিয়োগ করেছি। কারণ, চা–বাগানে প্রতি মুহূর্তে মূল্য সংযোজিত হয়। একবারে মুনাফা বেশি না হলেও ধারাবাহিক মুনাফার সুযোগ রয়েছে।

জেমকন গ্রুপের সাফল্য আছে চা চাষে। ২০০০ সালে হিমালয়ের পাদদেশে দার্জিলিংয়ের অদূরে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় কাজী অ্যান্ড কাজী চা–বাগানে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে গ্রুপটি। অর্গানিক চা–বাগান হিসেবে বৈশ্বিক স্বীকৃতিও পায় এ বাগানটি। যুক্তরাষ্ট্র আর যুক্তরাজ্যের বাজারে এই বাগানের চা শোভা পাচ্ছে। গত বছর বাগানটিতে প্রায় পাঁচ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হয়।

পথ দেখাচ্ছে পুরোনোরা

পারস্যের ইস্পাহান থেকে বোম্বে, কলকাতা থেকে ঢাকা হয়ে চট্টগ্রামে থিতু হওয়া ইস্পাহানি গ্রুপের পারিবারিক ব্যবসা ২০০ বছরের। আসাম টি কোম্পানির সদস্য ছিল ইস্পাহানি পরিবার। পাকিস্তান আমলেও এই কোম্পানি চায়ের বাজারে শীর্ষস্থানে ছিল। ইস্পাহানির চারটি বাগান ছাড়াও ফিনলে টি কোম্পানিতে অংশীদারি রয়েছে।

ট্রান্সকম গ্রুপের ভিত গড়ে উঠেছিল চা ব্যবসা দিয়ে। গ্রুপটির প্রয়াত চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের দাদা খান বাহাদুর ওয়ালিউর রহমান ১৮৮৫ সালে আসামে চা–বাগান শুরু করেন। দেশভাগের পর সিলেটে নতুন করে চা–বাগান করেন পরিবারের সদস্যরা। ট্রান্সকম গ্রুপের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এম রহমান টি কোম্পানি, মণিপুর টি কোম্পানি এবং মেরিনা টি কোম্পানির মাধ্যমে চায়ের ব্যবসায় যুক্ত আছে গ্রুপটি।

দেশীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে পুরোনো আরেকটি এম আহমেদ গ্রুপ। ১৯২১ সালে লন্ডনের অক্টাভিয়াস স্টিল অ্যান্ড কোম্পানি থেকে মৌলভীবাজারের চান্দবাগ চা–বাগান ইজারা নিয়ে চা চাষে যুক্ত হয় গ্রুপটি। বর্তমানে গ্রুপের আটটি বাগান রয়েছে। ম্যাগনোলিয়া ব্র্যান্ডের চা বাজারজাত করছে তারা।

এম আহমেদ টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ব্যাংক এশিয়ার ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাফওয়ান চৌধুরী বলেন, ‘চা ব্যবসায় এখন ৯৯ বছর চলছে। আটটি বাগানে এখন বছরে ৩২ লাখ কেজি চা উৎপাদিত হচ্ছে।’

প্রায় ৯৬ বছর আগে নিবন্ধিত কেদারপুর টি কোম্পানি লিমিটেডের মালিকানায় ১৯৬০ সালে যুক্ত হন দৈনিক সংবাদ পত্রিকার প্রয়াত প্রধান সম্পাদক আহমেদুল কবির। পর্যায়ক্রমে পরিত্যক্ত তিনটি বাগান কিনে ফলনে সাফল্য দেখায় দেশীয় কোম্পানিটি। পরে ব্রিটিশ অক্টাভিয়াস স্টিল কোম্পানি থেকে সাতগাঁও বাগানও যুক্ত হয় তাদের বহরে।

কোম্পানির বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক লায়লা রহমান কবিরের হাত ধরে মধুপুর বাগান সর্বোচ্চ গুণগত মানের চা উৎপাদনের জন্য ২০১৮ সালে পুরস্কার পেয়েছে। এখনো নিলামে সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হয় এই বাগানের চা।

টিকে আছে তিন ব্রিটিশ কোম্পানি

স্টারলিং কোম্পানি হিসেবে পরিচিত ইউরোপিয়ান কোম্পানিগুলোর মধ্যে ব্যবসা ধরে রেখেছে ডানকান ব্রাদার্স বাংলাদেশ লিমিটেড। চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ডানকানের হাতে আছে ১৬টি বাগান। জমির মোট পরিমাণ ৪৫ হাজার ৭৬৮ একর। এ ছাড়া দ্য নিউ সিলেট টি কোম্পানি এবং দেউন্ডি টি কোম্পানির পাঁচটি বাগান আছে এই তালিকায়। এই তিন কোম্পানিই যুক্তরাজ্যে নিবন্ধিত।

চা বোর্ডের তথ্যে দেখা যায়, ২০০৬ সালে ফিনলের বাগান দেশীয় শিল্প গ্রুপের হাতে আসার পর থেকে এ পর্যন্ত উৎপাদন বেড়েছে ৭৯ শতাংশ। একই সময়ে ডানকানের বাগানের উৎপাদন বেড়েছে ১৮ শতাংশ। দেউন্ডি টি কোম্পানির উৎপাদন বেড়েছে ৩৬ শতাংশ।

একই সময়ে দেশীয় শিল্প গ্রুপের উৎপাদন তুলনা করে দেখা যায়, ইস্পাহানির চার বাগানে ১১৪ শতাংশ, ট্রান্সকমের তিন বাগানে ৫২ শতাংশ এবং কেদারপুর টি কোম্পানির চার বাগানে ৫০ শতাংশ উৎপাদন বেড়েছে, যা ব্রিটিশ কোম্পানির উৎপাদন হারের চেয়ে বেশি।

বাজার বড় হচ্ছে

ভারতীয় লেখক ও সাবেক মন্ত্রী শশী থারুর ইনগ্লোরিয়াস অ্যাম্পায়ার বইতে জানাচ্ছেন, উপমহাদেশে চা চাষ শুরুর প্রথম এক শ বছরে এখানকার উৎপাদিত চা নেওয়া হতো ব্রিটেনে, যেখানে চাহিদা বেশি। ১৯৩০ সালের মহামন্দায় ব্রিটেনে চায়ের চাহিদার পতন হয়। ইতিহাস বলছে, ইউরোপিয়ান কোম্পানিগুলো তখন বিনা পয়সায় মানুষের মুখে চা তুলে উপমহাদেশেও বাজারজাত শুরু করে।

তবে বিনা পয়সায় চা খেয়ে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এ দেশের মানুষও। গত দুই দশকে চা ভোগের হার দ্রুতগতিতে বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাজারের আকার ছাড়িয়েছে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। এই বাজার ধরতে যুক্ত হয়েছে দেশীয় শিল্প গ্রুপও। উদ্যোক্তাদের আশা, বাজার বড় হতে থাকায় উৎপাদনের পরিমাণে ও পণ্যের বৈচিত্র্যে আরও সাফল্য যুক্ত হবে এদেশীয় শিল্প গ্রুপের হাত ধরে।

Spread the love

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *